আমগাছ ছেয়ে আছে মুকুলে, লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে ২৫ হাজার মেট্রিকটন

সাজেদুল হক সাজু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ:আমের রাজধানী হিসেবে খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এই জেলার সুস্বাদু আমের ঘ্রাণ শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ নেই, সুভাস ছড়াচ্ছে ভিনদেশেও। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববাজারে সুনাম কুড়িয়েছে বহুবার। আমের শক্তির ওপর ভর করে টিকে আছে এই জেলার অর্থনীতি। চলতি মৌসুমে এখন পর্যান্ত জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আমগাছ ছেয়ে ফুটেছে ৮০ ভাগ সোনালি মুকুল। অনেক গাছে আমের গুটিও আসতে শুরু করেছে। এবার আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে ২৫ হাজার মেট্রিকটন।
আমগাছ কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে এই জেলায় প্রায় ৩৭ হাজার ৬০৪ হেক্টর জমিতে ৭৫ লাখ ৭৯ হাজার ৮২৫টি আমের চাষ হয়েছে। এই হিসাবে এবার জেলার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে চার লাখ ৫০ হাজার মেট্রিকটন আম। গত মৌসুমে জেলায় আম উৎপাদন হয়েছিলো চার লাখ ২৫ হাজার মেট্রিকটন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ৫টি উপজেলাতেই কম-বেশি আমের চাষ হয়।
তবে সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হয় শিবগঞ্জ উপজেলায়। এই উপজেলায় ২০ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে ২৩ লাখ ৩২ হাজার ৮২৫টি, সদর উপজেলায় পাঁচ হাজার ১৮০ হেক্টর জমিতে আমগাছ রয়েছে আট লাখ ৯৩ হাজার ৭০৫টি, গোমস্থাপুর উপজেলায় চার হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে সাত লাখ ৭৯ হাজার ৬৫০টি, নাচোল উপজেলায় চার হাজার ৩৩১ হেক্টর জমিতে ২৯ লাখ ৮ হাজার ৮৫০টি ও ভোলাহাট উপজেলায় তিন হাজার ৬৬৩ হেক্টর জমিতে ছয় লাখ ৬৪ হাজার ৭৯৫টি আমগাছ রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. পলাশ সরকার বলেন, গাছের বয়স নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলে আম উৎপাদনের সক্ষমতা কমে যায়। এবার আম উৎপাদনে জন্য অফ ইয়ার বা কম ফলনের বছর। এছাড়া, শীতের প্রভাব দীর্ঘদিন থাকায় আমগাছ ছেয়ে আমের মুকুলের পরিমাণ কম। তবে গরমের প্রভাব আরেকটু বাড়লে আরও কিছু গাছে আমের মুকুল আসতে পারে। কিন্তু, যেটি আসবে তা ফলনে প্রভাব পড়বে অর্থাৎ সময়ের মধ্যে যে মুকুলটা বের হয়, সেটায় যে পরিমাণ আম উৎপাদন হয়ার কথা সেটি দেরি হবে। তখন দেখা যাবে অনেক রকমের আম প্রায় একসাথে পাকবে। এতে আমগুলো বাজারজাতে সমস্যা হতে পারে বা চাষিরা কম দাম পেতে পারেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের একাধিক আমবাগান ঘুরে দেখা গেছে, বাগানের সারি সারি গাছে আমগাছ ছেয়ে মুকুল ফুটতে শুরু করেছে। তবে আমের ফলন নির্ভর করছে আবহাওয়ার ওপর। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর আমের বাম্পার ফলনের আশা করছেন বাগানমালিকেরা। ছোট ও মাঝারি আকারের গাছে বেশি মুকুল ফুটেছে।
শিবগঞ্জ উপজেলার দ্বায়পুকুরিয় ইউনিয়নের আম চাষি আবু জাফর লালান জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার আমের উৎপাদন অনেক ভাল হবে। তাই মুকুল নষ্টকারী ক্ষুদি, হুপার পোকা দমনে বাগান গুলোতে কৃষি বিভাগের পরামর্শে বাড়তি সার, কীটনাশক পানি ও গাছের গোড়া পরিছন্ন করছেন আম চাষিরা।
নাচোল পৌরসভার মেয়র ও আমচাষি আব্দুর রশীদ খান ঝাল্লু বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে চলতি বছর প্রায় ১০ হাজার বিঘা আম চাষের আওতায় এসেছে। তিনি বলেন, এ অঞ্চলে আম্রপালি, কাটিমন ও হাড়িভাঙ্গা গাছ গুলোতে আমগাছ ছেয়ে প্রচুর মুকুল এসেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আমচাষিরা উপকৃত হবে।
জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রায় সব জাতের আমের উৎপাদন হচ্ছে। লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছর কৃষিজমিতে বাড়ছে আমের আবাদ। আম্রপালি, ফজলি, ক্ষীরসাপাতি, ল্যাংড়া, গোপালভোগসহ বিভিন্ন জাতের আমের বাগান গড়ে উঠেছে। সম্প্রতি জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে ফজলি আম। এ কারণে আম রপ্তানির পরিমাণ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে এখানে আম চাষ হতো ২১ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে। ২০২৪ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৬০৪ হেক্টরে। ১৬ বছরে আম চাষে জমি বেড়েছে প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর। যুক্তরাজ্য, ইতালি, সুইডেন, কুয়েতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম রপ্তানি হচ্ছে। উৎপাদিত আম বেচাকেনায় এই অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি চাঙা হয়ে ওঠে। আমভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য গোটা এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতিতে নিয়ে আসে পরিবর্তন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. পলাশ সরকার জানান, চলতি বছর আমগাছ ছেয়ে মুকুল কিছুটা কম হলেও উৎপাদনে প্রভাব পড়বে না। দামে পুষিয়ে নেবেন কৃষকেরা। গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় ২৫ হাজার টন বেশি হয়ে উৎপাদন দাঁড়াবে ৪ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিকটন। ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আশা করছি চাষিরাও বেশ খুশি হবেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যাণ তত্ত্ব কেন্দ্রের উপপরিচালক ও ফল গবেষক ড. মুখলেসুর রহমান জানান, আমের মুকুল আসতে কিছুটা দেরি হলেও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আম উৎপাদন অনেক ভাল হবে।