বিশুমাঝির অপহৃত ধান

🕒 আপডেট: অক্টোবর ৩১, ২০২৫, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ

আব্দুল আলীম:


(গত সপ্তাহে প্রকাশের পর)
৪.
টাকার অভাবে অনেকে আগাম আখ বেচে দিতো। আর তা কেনার পাটি যে কম ছিলো তা না, তারা সংখ্যায় বেশ কয়েকজন। তারা গচ্ছিয়ে রাখতো। কৃষকের ঘরে যখন অভাব, টাকা দরকার, যখন কোথাও টাকা পেত না, তখন নিরুপায় হয়ে কম দামে ওসব দাদনদারদের কাছে আখ বেচতে হয়। এতে আখের মণে শ’পাঁচেক ক্ষতির শিকার হয়েও তা বাধ্য হয়ে মানতে হয়। ভিমের ডাইং গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় কাশেম মাতাল নামে এক লোক বাস করতো। তার আসল নাম আবুল কাশেম। লোকমুখে শোনা যায় তার আসল বাড়ি রাজশাহীর পূর্বাংশে। বৈবাহিকসূত্র ধরে কিংবা কামলা খাটতে এসে এখানে বসবাসের শুরু। সে পেশায় ব্যবসায়ী। পান, সিগারেট বিক্রির আড়ালে শিদ, তামাকপাতা বিক্রি করে। তাতেই সে থামেনি। তার সাথে চুয়ানি, তাড়ির বেচাকেনা চলতো রমরমা।

শিদ খাওয়ার মাটির কলকিও পাওয়া যেতো তার কাছে। সে শুধু অন্যকে খাওয়াতো তা না সে নিজেও খেতো আর মাতলামি করতো। সেই থেকে তার নাম হয়ে যায় কাশেম মাতাল। পাতলা কিশিমের লোক কিন্তু গায়ে শক্তি অনেক। আপন ব্যবসা নিয়ে সব সময় ব্যস্ত থাকতো। সে কারণে কথাবার্তা কম বলতো। হিসেবের বেলায় সে ছিল বেশ পাকা। দু এক পয়সা কম দেওয়ার সুযোগ নাই। হিসাব কষে কষেই টাকা জমিয়ে বেশ কিছু জমি জায়গা ও বাড়ি ভিটা কিনেছে। কাশেম মাতাল সুদে টাকা পয়সা কিংবা ধান ধার দিতো। তার সুদের ধরণ ছিল এক’শ টাকা নিলে তিন চার মাস পর দুইশত টাকা দিতে হতো। একমণ ধান দিলে ঐ রকম দুই-তিন মাস পর দুই মন ধান নিতো। এভাবে সে তার সুদের ব্যবসা চালিয়ে যেতো। কাশেম মাতালকে ব্যবসায় সহযোগিতা করতো তার স্ত্রী জৈগুণ। সেও হিসাব নিকাশে বেশ পাকা। স্বামীর অবর্তমানে সেই ব্যবসার কাজ দেখভাল করে। কেউ কেউ গভীর রাতে শিদ নিতে আসলে কাশেম মাতাল ঘুমিয়ে থাকতো আর জৈগুণ ঘুম থেকে উঠে কুপি হাতে নিয়ে বাঁশের বেড়ার ধারে এসে ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে, দর দাম ঠিক করে, দামটা আগে হাতে নিয়ে পরে বেড়ার ফাঁক দিয়ে হাতে-হাতে পণ্য ধরিয়ে দিতো। এভাবেই স্বামী-স্ত্রী’র সমঝোতায় ব্যাবসা দারুণ চলছিলো।

ইউসুফ আলী মন্ডল জোতদার হিসেবে খুব বড় জোতদার না হলেও সারা বছর শ্রমিক দিয়েই সংসারের কাজকর্ম ও ফসল উৎপাদনে জমি চাষাবাদসহ বাড়ির ফায়ফরমাস সব কিছুই করতো । বিশুমাঝি ও তার পরিবার এক নাগাড়ে সারা বছর মন্ডলের কাজকর্ম করে থাকে। কাজ শেষে বিকাল বেলা শনিবার ও মঙ্গলবার দামকুড়া হাটে একমণ ধান মাথায় করে নিয়ে গিয়ে তা বিক্রি করে তার কাজের মজুরি নিতো আর বাকি টাকা দিয়ে মন্ডল পরিবারের হাট বাজার করে আনতো। এভাবেই দিনগুলো চলতে থাকে। দেখতে দেখতে বিশুমাঝি ইউসুফ আলী মন্ডলের প্রিয়ভাজন হয়ে যায়। তাদেরকে আর অন্য কোথাও কাজ খুঁজতে যেতে হয় না। ধান লাগানো, আগাছা দমন, পরিষ্কার করা, ধান কাটা, ধান জোগানো, পাট বোনা, পাটের আগাছা পরিষ্কার করা, পাট কাটা, পাট ধোয়া, আখ লাগানো, আখ পরিচর্যা করা, সব মিলে সারা বছরই বিশুমাঝির কাজ হয় মন্ডলের বাড়িতে। বিশুমাঝির পিঠা-পিঠি দুটো মেয়ে তারা দেখতে দেখতে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে, বাপ-মা’র সাথে মাঠে কাজ করতে পারে, সেই দিক দিয়ে বিশুমাঝির একটু সুবিধা হয়, তারা কাজে গেলে চার জনের মজুরি পায়, খাবারও পায়। বিশুমাঝি একটু চিন্তা মুক্ত হলেও অন্যদিকে তার নেশা করার মাত্রাটা বেড়ে গেলো কয়েকগুণ। আগে সে একাএকা নেশা করতো, আর মাঝে মাঝে সুন্দরীর মা করতো, বিশেষ পার্বণ বুঝে। এখন কোন পার্বনের ধার ধারে না দুজনেই সমতালে নেশা করে টলতে টলতে বাড়ি ফিরে। বিশুমাঝিকে তার নেশার সব কিছু জোগান দিয়ে থাকে কাশেম মাতাল। তাকে সবাই সুদ খোর নামে চেনে।

বিশুমাঝির খারাপ অভ্যাস বলতে সে নেশা করে। নেশার ঘোরে আবোল-তাবোল বকে মাত্র। কথাগুলো এমনিতেই জড়ানো, নেশা করলে আরো বেশি জড়িয়ে যায় আর কি। অন্য যে সব ভালো দিকগুলো মানুষের যেমন থাকে তা সবই ছিল তার। যেমন কথা দিয়ে কথা রাখা, কাজেকর্মে অলসতা না করা। হাসি মুখে সে সবার সাথে কথা বলে, ধৈর্য ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে তার একটু বেশি। সত্য কথা বলে, মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেয় না। স্ত্রীকে ভালোবাসে, সন্তানদের ভালোবাসে, অল্পতে তুষ্ট থাকে। গেরস্তের অভাব অনটন বোঝার চেষ্টা করে। কারো ক্ষতি করে না। কাউকে গাল-মন্দ করে না, কটুকথা বলে না। সব সময় হাসি খুশি থাকে। একদিন এক বেলা না খেলেও কারও দুয়ারে যায় না। হাসির একটা রেখা যেন লেগেই থাকতো তার মুখে।

বিশুমাঝির বুকে এখন অনেক সাহস। কারণ এখন তারা চারজন কাজ করতে পারে। কাজের মজুরি কাজের সিদা,
কাজের লাহারী সবই চারজনে পায়। তাই একটু খুশি-খুশি ভাব। চারজনের উপার্জনের টাকা দিয়ে সাতজন বেশ
ভালোই চলছিল। ম-ল তার দশ বিঘা ধানের সব দায়িত্ব বিশুমাঝিকে দিয়েছেন। লাগানো, নিড়ানো, দেখভাল করা
এবং ধান পাক ধরলে কাটা ও মাড়াই সবই করবে বিশুমাঝি ও তার পরিবার। বিশুমাঝি এবার কাউকে সাথে আনেনি কারণ তার বাড়িতেই এখন চারজন শ্রমিক কাজ করে বাইরের লোকের প্রয়োজন খুব একটা দেখছে না। অনেক আনন্দেই আছে তারা। মনে-মনে ভেবে নিয়ে বসেই আছে ধান কাটা বাবদ অনেক ধান তারা ঘরে তুলতে পারবে। ছেলে মেয়েদের মুখের খাবার হবে অন্য খাবারের আর প্রয়োজন হবে না। এক বুক আশা নিয়ে চারজনেই সারাদিন ধান কাটে আর সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে, গা-গোসল করে রাতের খাবার রান্না করে। রাতের খাবার খেয়ে বিশুমাঝি একটা হারিকেন আর একটা লাঠি, আর একটা কাচি নিয়ে রাতে ধান পাহারা দিতে চলে যায়। সকালে সুন্দরীর মা বাড়ির কাজ, রান্না, করে সারাদিনের মত খাবার নিয়ে ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে মাঠে চলে যায়।

এই ভাবে চার জন মিলে প্রায় দুই মাস ধরে খেটে খুটে ধান তুলে আনে মাঠ হতে। এরপর ধান মাড়ায়ের কাজ শুরু হয়। একটা একটা করে উঠোনে ধান মাড়ায় করে আর গেরস্তের ঘরে তুলে দেয় আর হিসাব রাখে। হিসাব রাখে এই জন্য যে একদম শেষের দিন তাদের পারিশ্রমিকের ধান বুঝে নিবে। চলতে থাকে প্রতিদিন ধান মাড়াই আর বিশুমাঝি বুক বাধতে থাকে আনন্দে। এবার তারা অনেক ধান ঘুরে তুলতে পারবে।আশায় বুক যেন ওদের প্রসারিত হতে থাকে। মনে মনে অনেক আশা করে, স্বপ্ন বাঁধে। ভাবে হয়তো আমাদের আর অভাব থাকবে না। সুন্দরীর মা নতুন একটা শাড়ি নিবে, ছেলে মেয়েদের ভালো পোশাক পরিচ্ছদ কিনে দিবে, ভালো ভালো খাবার খাবে, কত আশা কত স্বপ্ন নিয়ে দুই মাস পরিশ্রম করে রাত জেগে, পাহারা দিয়ে, আশায়-আশায় বুক বেধে বসে ছিলো সবাই।


স্ত্রীর মুখের একটু হাসি, ছেলে মেয়েদের মুখের খুশি, একটু ভালো লাগা, একটু ভালোবাসা কতদিন দেখেনি বিশু মাঝি।পাঁচ-পাঁচটা সন্তানের আহার যোগাড় করতে-করতে হাঁপিয়ে উঠেছিল সে। মনে মনে ভাবছে এবার একটু আরাম করে খাওয়া যাবে। ছেলে মেয়েদের মুখে বেশ মিষ্টি-মিষ্টি হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। আজ ধান মাড়ায়ের শেষ দিন। মন্ডল দুপুরে ভালো খাবারের ব্যবস্থা করেছে। বিশুমাঝির পরিবার সবাই মুরগির মাংস ভাত আর দুধের পায়েশ দিয়ে খাবার খেল। তাদের মুখে যেন আনন্দের কর সইছেনা। দুপুর দুটার পর কাশেম মাতাল কয়েকটি খালি বস্তা মাথায় করে নিয়ে এসে উঠানের এক কোণে একটা আমগাছ আছে সেই গাছের তলায় ছায়াতে বসে পড়লো। কিছুক্ষণ পর কাশেম মাতালের বৌ জৈগুণ বিবিও একপা-একপা করে এসে হাজির হলো। এদিকে ধান মাপার কাজ চলছে, এক পর্যায়ে মজুরি হিসেবে আটমণ ধান পাওনা হলো বিশুমাঝি। বিশুমাঝিকে তার পরিশ্রমের আটমণ ধান বুঝিয়ে দিল ইউসুফ আলী মন্ডল। তারপর যা হলো…

কাশেম মাতাল বস্তার উপর দুই পা তুলে বকের মত করে বসে আছে। বক যেমন মাছ ধরার সময় চুপ করে ঠক ধরে
বসে থাকে ঠিক তেমনি বসেছিল কাশেম মাতাল, পার্শ্বে দাড়িয়ে আছে তার স্ত্রী জৈগুণ। বিশুমাঝির মুখে কোনো কথা নাই, সুন্দরীর মা কি টের পেল জানি না সেও কথা বলছে না একদম চুপ করে আছে সবাই। তারপর শোনা গেল, কাশেম মাতাল ধানের কাছে এসে বসে থাকার কারণ। গোপনে বিশুমাঝি দুইমণ ধান ধার করেছিল। কাশেম মাতালের কাছ থেকে, আর সে জন্যই আজ সুদে-আসলে আদায় করার জন্য স্ব-শরীরে এসে হাজির। অভাবের সময় দুইমণ ধান নিয়েছিল বিশুমাঝি গত এক বছর পরিশোধ করতে পারেনি তাই আজ তাকে আটমণ ধান শোধ করতে হবে। ছেলে মেয়েদেরও বুদ্ধি হয়েছে তারাও বুঝতে শিখেছে। কেউ কোন কথা বলছে না, নির্বাক সবাই কাজ করে যাচ্ছে। চোখে জল ছলছল করছে, শরীর ঘেমে যাচ্ছে, কাজে ভুল হচ্ছে, বেদনায় মুষড়ে পড়ছে, লজ্জায় মাথা নত হয়ে আসছে।

অবশেষে কি আর করা দুয়ারে মহাজন দাড়িয়ে তাকে আটমণ ধান মেপে দিয়ে অবশিষ্ট কিছু ধান মাথায় নিয়ে অনেক কষ্টে দুঃখে বাসায় ফিরে গেল। তারপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, আকাশে চাঁদ উঠলো, ঝলমলে তারাগুলো জ্বলে উঠলো, আর বিশু মাঝি ও তার পরিবারকে সান্ত¡না দিতে থাকলো। এভাবেই দিন চলে যায়। রাত চলে আসে। পড়ে থাকে স্মৃতি। কুয়াশাচ্ছন্ন আঁধার কেটে যায়। জ্বলে উঠে ঝলমলে সূর্য। যার আলোয় পথ চলতে চলতে চলতে আবার একদিন জেগে উঠে সুখের রেখা। (সমাপ্ত)