মোহনপুরে ফুটছে ‘পেরিলা’র ফুল কৃষিতে নতুন দিগন্ত

শাহীন সাগর, মোহনপুর:
দূর থেকে দেখে সবুজ কোনো শাকসবজির খেত মনে হয়েছিল। কাছে গিয়ে দেখা গেল, সারি সারি এক থেকে দেড় ফুট উচ্চতার গাছ। পাতার ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে সাদা রঙের ফুল। এই উদ্ভিদের নাম পেরিলা। উচ্চ পুষ্টিগুণ ও তেলসমৃদ্ধ ‘সুপারফুড’ খ্যাত ফসল পেরিলা এখন চাষ হচ্ছে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায়।
দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চিন, নেপাল, ভিয়েতনাম ও ভারতের কিছু অঞ্চলে জনপ্রিয় এ তেল ফসলটি এখন বাংলাদেশের কৃষিতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
স্থানীয় কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় এই মৌসুমে মোহনপুর উপজেলার ৪টি স্থানে প্রায় ৩ বিঘা জমিতে পেরিলা চাষ করা হয়েছে। বর্তমানে গাছে ফুল ফুটেছে, আর সেই ফুলে মৌমাছির আনাগোনায় মুগ্ধ স্থানীয় কৃষক ও দর্শনার্থীরা।
পেরিলা মূলত খরিপ-২ মৌসুমের তেলজাতীয় ফসল। এর বৈজ্ঞানিক নাম চবৎরষষধ ভৎঁঃবংপবহং, যা খধসরধপবধব পরিবারের সদস্য। দেখতে অনেকটা সরিষা দানার মতো হলেও এটি সূর্যমুখী ও সরিষার মতো তেল উৎপাদন করে। বেলে দোআঁশ বা দোআঁশ মাটিতে ভালো ফলন হয় এবং বৃষ্টির পানি না জমা উঁচু জমি এ চাষের জন্য উপযুক্ত।
চাষ পদ্ধতি ও ফলন: মধ্য জুলাইয়ে বীজতলায় চারা তৈরি করে আগস্টে মূল জমিতে রোপণ করা হয়। ৬০-৭০ দিনের মধ্যে ফসল কর্তনের উপযোগী হয়। প্রতি বিঘায় গড়ে ৪–৬ মণ ফলন পাওয়া যায়। বাজারে প্রতি কেজি বীজের দাম ২০০-২৫০ টাকা, আর এতে ৩০-৪০% তেল পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে এ তেলের মূল্য লিটারপ্রতি ২,১০০-২,৫০০ টাকা পর্যন্ত।
পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা: মোহনপুর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ কামরুল ইসলাম বলেন, পেরিলা তেলে প্রায় ৯২ শতাংশ অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে ওমেগা-৩, ওমেগা-৬ ও ওমেগা-৯ ফ্যাটি অ্যাসিড পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে। তেলের ইরোসিক অ্যাসিডের পরিমাণ শূন্য হওয়ায় এটি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। পরীক্ষামূলকভাবে এই চাষে কৃষকদের সাড়া আশাব্যঞ্জক। আগামী মৌসুমে এর পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।”
কৃষকদের অভিজ্ঞতা: মৌগাছি গ্রামের কৃষক মো. মহসিন আলী বলেন, “প্রথমবারের মতো কৃষি অফিসের সহায়তায় পেরিলা চাষ করেছি। আমবাগানের ফাঁকা জায়গায় চাষ করেছি, ফলন ভালো হয়েছে। দাম ভালো পেলে আগামী বছর আরও বড় পরিসরে করবো।”
এছাড়া বিদিরপুর গ্রামের মো. নবাইদুল ইসলাম এবং জাহানাবাদ গ্রামের মো. ইলিয়াস কাঞ্চন তাদের পেয়ারা ও কাঠাল বাগানের মাঝে পেরিলা চাষ করেছেন। তারাও পতিত জমি ব্যবহার করে ভালো ফলনের আশা করছেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পেরিলা বাংলাদেশের তেলবীজ ঘাটতি পূরণে এবং স্বাস্থ্যসম্মত ভোজ্যতেল উৎপাদনে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।